২৩. ইহুদী কন্যা

ইসহাক ঘোড়াটিকে কোনই সাহায্য করতে পারল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো বোবা জানোয়ারটির করুণ মৃত্যু।

এটা ছিল উঁচু জাতের যুদ্ধের ঘোড়া। এ জাতের ঘোড়া সবসময় সতেজ থাকতো। সহজে পিপাসায় দুর্বল হতো না। ঘোড়াটির মৃত্যু ইশাকের জন্য মহা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল।

এ এমন এক ক্ষতি যা পুরণ হওয়ার নয়। কিন্তু এ ক্ষতিতেও সে কাতর হতো না, যদি স্বাভাবিক সময়ে এর মৃত্যু হতো। কিন্তু ঘোড়াটি মারা গেল এমন এক সময়ে, যখন সে দুর্গম মরুভূমিতে এবং এ ঘোড়াটিই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী ও বাহন।

ইসহাককে এখন পায়ে হেঁটেই কায়রো যেতে হবে এবং তাকে কায়রো পৌঁছতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। সে জানতো, সে যে গোপন তথ্য তার বুকের মধ্যে করে নিয়ে যাচ্ছে, যদি তা শিঘ্রই সুলতান আইয়ুবীকে জানাতে না পারে তবে যুদ্ধের এক বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবেন সুলতান।

সে ঘোড়াটির দিকে নিরাশ দৃষ্টিতে তাকালো। তার দৃষ্টি ঘোড়ার পায়ের খুরের একটু উপরে গিয়ে পড়লো। ওখানে কয়েক ফোঁটা রক্ত জমে আছে। সে বুঝতে পারল, এখানেই সাপটি দংশন করেছিল।

ইসহাক ঘোড়ার জিনের মধ্য থেকে খেজুরের ব্যাগ বের করে নিল। পাইর মশকটিও খুলে নিল এবং দ্রুত কায়রোর দিকে যাত্রা করলো। সে মরা সাপটার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘খৃস্টান ও সাপ এই দুই জাতির স্বভাব এক! মানুষের জন্য এদের অন্তরে কোন দয়া মায়া নেই।’

সে মরু অঞ্চল দিয়ে দ্রুত ছুটতে লাগল এবং এক সময় ভয়ংকর মরু অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা পার হয়ে এলো!

সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে। কমে গেছে সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপের তীব্রতা।

এটা ছিল ১১৮২ সালের এপ্রিল মাস। দুনিয়ার বুক জুরে তখন চলছিল বসন্তের ঋতুকাল। কিন্তু মরুভূমিতে কোন দিনই বসন্ত আসে না। ইসহাক তুর্কীর সামনে দিগন্ত বিস্তৃত শুধু ধু ধু বালির সমুদ্র। যার মধ্যে ছোট ছোট শুকনো ঝোপ আর জঙ্গলের কাঁটা ছাড়া আর কিছুই নেই।

বালির দিকে তাকালে মনে হয় সামনে এক আধ মাইল জুড়ে শুধু পানি আর পানি। সে চলতে থাকল এবং চলতে চলতে এক সময় তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। তার মনে হচ্ছিল, সেখান থেকে ভীষণ ভাপ উঠছে।

ইসহাক তখনো খেজুরের ব্যাগ, পানির মশক, তলোয়ার ও খঞ্জরের বোঝা বহন করেই সামনে এগুচ্ছিল। তার চলার গতিতে তখনো ভাটা পড়েনি। দ্রুত কায়রো পৌঁছার কঠিন সংকল্পেও কোন টান পড়েনি। সে কয়েক ঢোক পানি পান করে সমান উদ্যমেই আবার হাঁটা ধরলো।

দেখতে দেখতে চোখের সামনে অস্ত গেল লাল সূর্য। ক্লান্তিতে পা দুটো তার অবশ হয়ে এলো। সে সামান্য সময়ের জন্য থামলো। কিছু খেজুর খেয়ে পানি পান করলো। কয়েক মিনিট লম্বা হয়ে শুয়ে রইলো বালির ওপর। তারপর উঠে বসে স্মরণ করলো তার সংকল্পের কথা।

সে এজন্য খুব খুশী ছিল যে সে খুব গোপন ও মুল্যবান সংবাদ নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর কাছে যাচ্ছে। এই খুশীতে সে খাওয়া এবং পান করার কথাও বেমালুম ভুলে যেতে পারে।

প্রশান্ত মন নিয়েই সে আবার উঠে দাঁড়াল। দায়িত্ববান লোক যখন দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি সক্ষম থাকে তখন তার আত্মাও আনন্দে ভরে থাকে। ইসহাক তুর্কীর আত্মাও তেমনি আনন্দে মশগুল ছিল। সে উঠে তারা দেখলো। দিক নির্ণয় করে নিয়ে আবার যাত্রা করলো।

মরুভূমির রাত খুব ঠাণ্ডা হয়। দিনে যেমন প্রখর উত্তাপ থাকে তেমনি রাতে ঠাণ্ডাও পড়ে প্রচণ্ড। তবে দিনে উত্তাপের কারণে পথ চলতে যে কষ্ট হয়, রাতে ঠাণ্ডায় তা হয়না। বরং পথ চললেই ঠাণ্ডার প্রকোপ কম মনে হয়।

ইসহাক তুর্কী পথ চলছে। বড় নিঃসঙ্গ সে যাত্রা। কোন প্রাণের প্রবাহ নেই কোথাও। শুধু বালি আর বালি। মাথার উপরে মিটিমিটি তারার আলো। প্রকৃতিকে এমন নিবিড়ভাবে উপভোগ করার সুযোগ তার আর হয়নি কখনো। মনে হচ্ছে জগত সংসারে সে ছাড়া আর সকলেই সুপ্তির আতল তলে হারিয়ে গেছে।

পথ চলতে চলতে স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠছে অনেক পুরনো স্মৃতি। মনে জাগছে অদ্ভুত সব স্বপ্ন-কল্পনা। তার মনে পড়ে গেল প্রিয় নবীর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের কাহিনী। তিনিও তো এভাবেই গভীর রাতে নিঃসঙ্গ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন মদীনার দিকে।

তখনো নিশ্চয়ই মরুভূমি ছিল আজকের মতই সুনসান। তবে তিনি একা ছিলেন না, তাঁর প্রিয় সাহাবী হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাছাড়া তাদের সাথে ছিল জীবন্ত বাহন। কিন্তু আমি? আমার যে আজ সে সম্বলটুকুও নেই!

সে এসব চিন্তা করছিল আর পথ চলছিল। অনেক রাতে যখন ঘুম আর ক্লান্তি তাকে কাবু করার জন্য এগিয়ে এল, তখন সে মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হল, কোন বাহন ছাড়া এই দীর্ঘ পথ অল্প সময়ে পাড়ি দেয়া আসলেই এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

জীবনে একটি ঘোড়া কত মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় তা আবার নতুন করে উপলদ্ধি করলো সে। কি করে এখন একটি ঘোড়া জোগাড় করা যায় ইসহাক তুর্কী হাঁটতে হাঁটতে সে কথাই ভাবতে লাগল।

এখন ঘোড়া জোগাড় করার দুটি পথ আছে। এক. যদি পথে কোন ঘোড় সওয়ার বা উটের যাত্রী পাওয়া যায় তবে তাদের কাছ থেকে ঘোড়া অথবা উট কেড়ে নেয়া। আর দ্বিতীয় উপায় হলো, যদি কোন কাফেলা চোখে পড়ে তবে সেই কাফেলায় মিশে তাদের কাছ থেকে ঘোড়া অথবা উট চেয়ে নেয়া বা দিতে না চাইলে কৌশলে চুরি করা।

যাই হোক আগে তাকে কোন যাত্রী বা কাফেলা পেতে হবে। কিন্তু দুর্গম এ মরুভূমিতে কে আসবে কাফেলা নিয়ে মরতে! কালেভদ্রে কোন দুঃসাহসী নিতান্ত প্রাণের দায়ে সিনাই মরুভূমিতে পা রাখে। শুধু যাযাবর দস্যুরাই সিনাইকে ভাবে তাদের নিরাপদ অভয়ারণ্য। কখনো আত্মগোপন করার দরকার হলে ঢুকে পড়ে এ মরুভূমিতে।

ইসহাক তুর্কী আদৌ কোন ঘোড়ার সন্ধান পাবে এমন আশা ছাড়াই পথ চলতে লাগলো।

রাত গভীর থেকে গভীরতর হলো। তারারা একদিক থেকে হেঁটে গেল অন্যদিকে। আদম সুরত চলতে চলতে এখন যেখানে এসে পৌঁছেছে তাতে বলা যায়, রাত আর বেশী নেই। আর হয়তো এক-দেড় ঘণ্টা, তারপরই উন্মেষ ঘটবে সুবহে সাদিকের।

সারারাত পথ চলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ইসহাক তুর্কী। নিজের পা দুটোকেই এখন মনে হচ্ছে অনেক ভারী। সে তাকালো ধ্রুবতারার দিকে। না, এখনো ঠিক পথেই এগুচ্ছে সে। পথ আর কতো বাকী জানা নেই, কিন্তু ঠিক পথে এগুচ্ছে বুঝতে পেরেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।

রাত অতীত হয়ে যাচ্ছিল। পায়ের নিচ থেকে পিছলে সরে যাচ্ছিল বালি। কোথাও বালির ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছিল পা। সেখান থেকে পা টেনে নিয়ে বের করে নিয়ে তারপর সামনে ফেলতে হচ্ছিল। এসব কারণে তার ক্লান্তি আরও বেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে এক কমান্ডো সেনা, দীর্ঘ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোয়েন্দা। একাধারে কয়েক রাত না ঘুমানোর এবং কয়েক দিন ক্ষুধা তৃষ্ণা সহ্য করে পথ চলার মত ট্রেনিং তার ছিল। তাই সে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও নিদ্রাহীনতায় এখনো কাবু হয়নি। ঘোড়া হারিয়েও হতাশায় মুষড়ে পড়ে নি। সংকল্প থেকে বিন্দুমাত্র সরে দাঁড়ায় নি। সংকল্প থেকে বিন্দুমাত্র সরে দাঁড়ায়নি। বরং নতুন উদ্যমে নতুন পরিকল্পনায় পথের সমস্ত বাঁধা মাড়িয়ে সে মঞ্জিলপানে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু তারপরও মানুষের শরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আরাম না পেলে ক্লান্ত হবেই। সেই ক্লান্তি তাকে বারবার আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছিল, আর সে চাচ্ছিল সেই ক্লান্তিকে কবর দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে।

আর যখনই সে ক্লান্তির চাপ অনুভব করত তখনই প্রাণ খুলে যুদ্ধের গান শুরু করে দিত। সেই গানের সুর ও শব্দের মাঝে লুকিয়ে থাকতো উদ্দীপনার বীজ। এ গানের আওয়াজ তার কানে গেলেই তাঁর ক্লান্তি ও বেদনারা পালিয়ে যেত। তাঁর শরীরে ফিরে আসত উদ্যম ও সতেজতা। সে তখন উচ্চ স্বরে গান গেয়ে আরো জোরে পা চালাতো।

রাতের শেষ প্রহর।

এক স্থানে বালির উপর পা ছড়িয়ে বসে পড়ল ইসহাক তুর্কী। মশক খুলে সামান্য পানি পান করলো। তারপর ক্ষুধা থাকার পরও কিছু মুখে না দিয়েই সেখানে শুয়ে পড়লো। উদ্দেশ্য, কয়েক মিনিট ঘুমিয়ে নেয়া।

এটাও কমান্ডো বাহিনীর ট্রেনিংয়েরই একটা অংশ। শরীর ও মনকে এসব কমান্ডোরা এমনভাবে তৈরী করেঈনিতে পারতো, চব্বিশ ঘণ্টার ঘুমের কাজ তারা দশ মিনিটেই সেরে নিতে পারতো।

যখন তার ঘুম ভাঙলো তখনো সূর্য উদয় হয়নি। সে বালির উপর উঠে বসে চারদিকে তাকাল। সেখান থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ফেলল আকাশের শরীরে। আকাশ তাকে বলল, তৈরী হও যুবক। তোমাকে জব্দ করার জন্য সূর্য উঠে আসবে একটু পরই।

ঘাবড়াল না ইসহাক। সে উঠতে যাবে, তার পেট বলল, পথে নামার আগে কিছু খেয়ে নিলে কি হতো না!

না, পেটের দাবী অগ্রাহ্য করে উঠে দাঁড়াল ইসহাক। সামনে অনেক পথ। এখনই সব খাবার ও পানি শেষ করে ফেললে এই অসতর্কতাই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে কিছু মুখেও দিল না, পানিও পান করলো না। বরং সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সূর্য উঠার আগেই আবার যাত্রা করলো।

ভোরের আলো যখন ফুটলো তখন সে সূর্যের উল্টো দিকে হাঁটছিল। সূর্যের আলো পিঠে পড়তেই রাতের শীত ও ঠাণ্ডার আমেজ হারিয়ে গেল। নতুন করে ফুরফুরে একটা ভাব এসে মনকে চাঙ্গা করে দিল। কিন্তু এই পুলকিত অনুভূতিটা বেশীক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ সামনের একটি দৃশ্য তার আনন্দিত চেহারাটিকে মলিন করে দিল।

সে সামনে তাকিয়ে দেখতে পেল মরুভূমির মাঝে মাথা উঁচু করে বসে আছে ভয়ঙ্কর এক বিপদ। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে বালির গোল গোল স্তূপ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এগুলো কতটা ভয়াবহ যার অভিজ্ঞতা নেই সে কল্পনাও করতে পারবে না। এগুলো দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। সবগুলো স্তূপই সমান উঁচু।

যাত্রীকে এসব স্তূপ পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এর মধ্যে গিয়ে পড়লে এক ধরনের গোলকধাঁধায় জড়িয়ে পড়ে মানুষ। চারপাশে যেদিকেই চোখ যায় সর্বত্র একই রকম দৃশ্য। সেখানে কোন নতুন যাত্রী প্রবেশ করলে সহজে বের হতে পারে না। দেখা যায় একই স্তুপের পাশ দিয়ে বার বার ঘুরছে। এই গোলকধাঁধায় একবার পড়লে বিভ্রান্ত মুসাফির একই টিলার পাশ দিয়ে বার বার ঘুরে আর মনে করে সে অনেক পথ অতিক্রম করে ফেলেছে।

মরুভূমির এই রহস্যের খবর ইসহাক তুর্কী ভাল করেই জানতো। সে সহজে ভীত হওয়ার লোক নয়, তারপরও এই টিলাগুলো তাকে ভাবিয়ে তুলল। তার ভয় পাওয়ার কারণ হলো, সে তার গন্তব্যে পৌঁছতে যে পথের কথা জানতো সে পথে এ ধরনের টিলা পড়ার কথা নয়। টিলাগুলো দেখে প্রথমেই তার মনে যে প্রশ্ন জাগলো, তা হলো, তবে কি আমি পথ ভুল করে ফেলেছি? আমার চলার রাস্তায় তো এসব টিলা পড়ার কথা নয়?

সমস্যাটি তাকে অধীর করে তুলল। সে তার আসল রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কিনা বুঝার জন্য এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু আশেপাশে আর কোন রাস্তা নেই। এমন কোন পথ নেই যে পথে সে তার আসল গন্তব্যের দিকে যেতে পারে। উপায়ন্তর না দেখে সে ওই পথেই সামনে অগ্রসর হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে ওই টিলার রাজ্যে গিয়ে প্রবেশ করলো।

সে হাঁটছে তো হাঁটছেই, কিন্তু টিলার অরণ্য শেষ হচ্ছে না। দেখতে দেখতে সূর্য মাথার উপর উঠে এলো। মরুভূমির উত্তপ্ত লূ-হাওয়া কামড় বসালো তার গায়ে। সে টিলাগুলোর পাশ ঘুরে যতটা সম্ভব পথ ঠিক রেখে চলতে লাগলো। একটার পর একটা টিলা পেরিয়ে সে এখন এমন জায়গায় অবস্থান করছে, যার চারপাশে শুধুই সে বালির পাহাড়।

কোথাও কোথাও দুই টিলার বালি গড়িয়ে এসে একাকার হয়ে গেছে। ইসহাক সে এলাকা পেরোতে গেলেই নরম বালি তার পা টেনে ধরছে।

কোথাও বালি ক্ষুদ্র দানার, কোথাও বেশ বড়সড়। হাঁটতে হাঁটতে সে এক পাথুরে প্রান্তরে এসে পৌঁছল। এখানেও সেই ঢিবি আছে, তবে বালির সাথে জড়াজড়ি করে আছে অসংখ্য পাথর।

আগের চেয়ে এ পথ আরো দুর্গম। ইসহাক এ পথে পা দিয়েই বুঝল, এখানে সে নতুন অভিজ্ঞতা নিতে যাচ্ছে। কারণ, মরুভূমি সম্পর্কে তার বিস্তর অভজ্ঞতা থাকলেও এ ধরনের বিচিত্র বালিয়াড়ি সে কখনো দেখেনি। শুধু দেখেনি বললে ভুল হবে, এরকম বালিয়াড়ি পথের কথা সে কারো কাছে শোনেওনি।

তার মনে হলো সে-ই একমাত্র মুসাফির যে এই বিচিত্র পাথর ও বালির রাস্তা দিয়ে এই প্রথম হাঁটছে। এর আগে আর কোন মুসাফির এই পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা লাভ করেনি।

সূর্য এখন পুরোপুরি মাথার উপর। সে বালি ও পাথরের টিলাগুলো পাশ কাটিয়ে মোড় ঘুরে নির্বিকার চিত্তে হাঁটছিল, হঠাৎ একটি দৃশ্য দেখে সে থতমত খেয়ে থেমে গেল।

সে দেখলো সামনে পথের উপর পাথরের পাশে যে বালি, সেই বালিতে কোন মুসাফিরের হেঁটে যাওয়ার পদচিহ্ন। সেই পায়ের ছাপ দানে মোড় নিয়ে এক টিলার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এবার সে সত্যি ভয় পেল। তার আর বুঝতে বাকি রইল না, সে মরুভূমির ধোঁকায় পড়ে গেছে। এখন সে শত শত মাইল গোলকধাঁধায় পড়ে শুধু ঘুরপাক খাবে কিন্তু এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার সাধ হয়তো তার আর কোনদিনই পূরণ হবে না। এ জন্যই সিনাই মরুভুমিকে অনেকে ‘মরণ ঘর’ বলে অভিহিত করে। সিনাই মরুভূমিতে যারা পা রেখেছে তাদের মধ্যে খুব কম লোকই জীবন নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছে।

ইসহাক তুর্কীর নিজের উপর যথেষ্ট বিশ্বাস ও আস্থা ছিল। কিন্তু এ দৃশ্য দেখার পর তার সব বিশ্বাস ও আস্থা কর্পূরের মত হাওয়া হয়ে গেল। সেখানে এসে বাসা বাঁধল সীমাহীন বিপদের ভয়। সেই বিপদ ও ভয়ের শিরশিরে অনুভুতি বুকে নিয়েই সে পাশের এক টিলার উপের উঠে দাঁড়ালো। সেখানে দাঁড়িয়ে সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো দূর দিগন্তে। যত দূর দৃষ্টি যায় শুধু টিলা আর টিলা। ডানে বামে সামনে পেছনে সর্বত্র একেই দৃশ্য। এ ছাড়া সেখানে আর দেখার কিছু নেই।

বিপদের ভয়াবহতা উপলদ্ধি করে মুষড়ে পড়লো ইসহাক তুর্কী। সে ওখানেই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভাবতে লাগল, এখন কি করবে।

মধ্য দুপুরের সূর্য শুষে নিচ্ছিল তার শরীরের অবশিষ্ট রসটুকু। মরুভূমির তপ্ত বালু তাকে করছিল খই ভাজা। কিন্তু কিছুই করার ছিল না তার।

ইসহাক তুর্কী কোন সাধারণ মানুষ ছিল না। সে ছিল এক কমান্ডো গোয়েন্দা। এ ধরনের বিপদ মোকাবেলার জন্য তাদের মত কমান্ডোদের দেয়া হতো দীর্ঘ ট্রেনিং। এতদিন সে ট্রেনিং নিয়েছে, একাধিকবার মহড়া দিয়েছে দুর্গম মরুভূমিতে। কিন্তু আজ?

আজ আর মহড়া নয়, নিরেট বাস্তবতা মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। এখন এ কঠিন বাস্তবতার মোকাবেলা তাকে করতে হবে বুদ্ধি প সাহস দিয়ে। সফল চাল দিতে পারলে বেঁচে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরী হতে পারে। কিন্তু মাত্র একবার কোথাও কোন ভুল করে বসলে তার মাশুল হয়তো গুনতে হবে নিজের জীবন দিয়ে।

বিমর্ষ মন নিয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিক নির্ণয় করে ঢিবি থেকে নেমে এলো ইসহাক তুর্কী। সমতলে নেমে দুটি খেজুর মুখে দিয়ে একটু পানি পান করলো। তারপর স্মরণ করলো নিজের দায়িত্বের কথা। সংকল্পের কথা। সব শেষে আল্লাহর উপর ভরসা করে পা বাড়াল সামনে। এখন তাকে মাথা ঠিক রেখে চলতে হবে। অযথা ঘুরপাক খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার বুদ্ধি বের করতে হবে।

বালি ও পাথরের মধ্যে পা ফেলে ধীরে ধীরে হেঁটে যেতে লাগল ইসহাক তুর্কী। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, প্রতিটি মোড় ঢিবিতে চিহ্ন রেখে এগুবে সে।

ইসাহাক তুর্কী তার ট্রেনিং অনুযায়ী প্রতিটি মোড় ও ঢিবিতে চিহ্ন রেখে এগুতে লাগলো। এক সময় সে দুটি টিলার মাঝ দিয়ে তৈরী হওয়া গিরিপথে নেমে গেল।

দু’পাশের দৃশ্য ভাল মত স্মরণে রেখে পথ চলতে লাগলো ইসহাক তুর্কী। কিছু দূর গিয়ে পিছনে ফিরে দেখতো, তারপর পথের চিহ্ন ভাল মত মনে গেঁথে নিয়ে আবার সামনে পা বাড়াতো।

এভাবে সে অনেক পথ পেরিয়ে এলো। যদি সে বলিষ্ঠ যুবক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক না হতো

 তবে পরুভুমির এ নিষ্ঠুর পরিবেশ এতক্ষণে তার মাথা গুলিয়ে দিত। কিন্তু তার ধৈর্য ও সহ্য করার শক্তি ছিল অপরিসীম। নিজের এই ধৈর্য দেখে নিজেই সাহসী হয়ে উঠলো ইসহাক তুর্কী। সূর্যের প্রখর তাপ ও লূ হাওয়ার ঝাপটা অগ্রাহ্য করে সে বিরতিহীনভাবে পথ চলতে লাগলো।

সূর্য পশ্চিম দিগন্তের দিকে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে তার পা অবশ হয়ে আসছিল। সে তবু পা টেনে টেনে চলতে লাগল।

এক সময় সে সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখলো জোহরের ওয়াক্ত প্রায় শেষ হতে চললো। সে এক জায়গায় থেমে তায়াম্মুম করে জোহরের নামাযে দাঁড়িয়ে পড়ল। সালাম ফিরিয়ে যখন সামনে তাকাল তখন দেখতে পেল সে মরুভূমির ফাঁদ থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। সামনে আবার সমান্তরাল মরুভূমি।

ক্লান্ত পায়ে সে আবার উঠে দাঁড়াল এবং হাঁটতে শুরু করল। আরো ঘণ্টাখানেক এগিয়ে যাওয়ার পর সে অনুভব কর্‌ তার পা আর চলছে না, দেহের বোঝা বহন করতে পারছে না কোমর। সে অসম্ভব দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়েছে।

কিন্তু দায়িত্বের বোধ তাকে কোথাও থামতে দিল না, সে সেই দুর্বল শরীর নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে থাকলো।

কিছু দূর যাওয়ার পর সে অনুভব করলো, তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে। সামনে সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু থামল না, এগিয়েই যেতে থাকল। তবে বেশী দূর যেতে পারল না ইসহাক তুর্কী, সহসা সে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল।

তার জীবনী শক্তি প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছিল। শরীরের শক্তি নয়, কেবল অটুট মনোবলের কারনেই সে এতদূর পথ পেরিয়ে আসতে পেরেছে।

মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও সে মনের জোর হারাল না। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। বড় বড় করে দম নিল কয়েকবার। তারপর আবার উঠে বসল এবং দুর্বল পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে গেল।

সে বার বার মাথা ঝাঁকি দিয়ে নিজের চিন্তাশক্তিকে একত্রিত করে কর্তব্য নির্ধারণ করতে চেষ্টা করল। একবার ভাবল, বিশ্রাম নেয়। কিন্তু পরক্ষনেই এ চিন্তা বাতিল করে দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

অন্তরের তাগিদেই সে আবার পা চালিয়ে দিল। কিছু দূর যেতেই সে দেখতে পেলো, সামনে এক লাইনে কতগুলো রাস্তা সমান্তরালে এগিয়ে গেছে। সে নিজেকে তারই একটি রাস্তার ওপর নিয়ে গেল।

এক সময় তার মনে হলো পাশের রাস্তাগুলোর দূরত্ব ক্রমশঃ বাড়ছে এবং দূরত্ব নিয়েই তারা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। সে দেখতে পেল, পাশের একটি রাস্তা দিয়ে কিছু ঘোড়া তাকে অতিক্রম করে ছুটে যাচ্ছে। ঘোড়ার উপর আরোহীও আছে।

সে গলা ছেড়ে আরোহীদের ডাকলো কিন্তু আরোহীরা থামলো না। সে আরও উচ্চস্বরে তাদের ডাকতে লাগলো কিন্তু কোন আরোহীই তার ডাকে সাড়া দিল না।

ইসহাক তুর্কী থেমে গেল, সে চোখ বন্ধ করে মাথা জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল। তার বিশ্বাস, সে আসলে কোন ঘোড়া দেখেনি, সবটাই মনের বিভ্রম।

মরুভূমিতে চলতে গেলে এরকম হয়। চলতে চলতে যাত্রী যখন ক্লান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে তখন এ রকম বিভ্রম অনেককেই জড়িয়ে ধরে। এটা মরুভূমির খুবই সাধারণ ঘটনা। মাথা ঠিক হলে দেখা যাবে, এগুলো কোন ঘোড়া নয়, স্রেফ ধাঁধাঁ।

মরুভূমির এ খেলায় কমবেশি সবাইকেই পড়তে হয়। সুস্থ মানুষও বিভ্রান্ত হয়ে মরীচিকা দেখে আর ভয়ার্ত দুর্বল অসহায় মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে নানা আজগুবি দৃশ্য দেখতে থাকে। এমন সব দৃশ্য যা আদৌ কখনো ঘটা সম্ভব নয়। আবার এমন দৃশ্যও দেখে, যা সে মনে মনে কল্পনা করে। তখন কল্পনাটাই মনে হয় বাস্তব রূপ ধরে চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে থাকে।

যাই হোক বার বার মাথা ঝাঁকি দিয়ে চোখ কচলে আবার যখন তাকাল, তখন নিজেকেই তার বোকা মনে হল। কোথায় ঘোড়া? চারদিকে সুনসান মরুভূমি। মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য আর পায়ের নিচে ঝলসানো বালি। রোদের উত্তাপ বাতাসে ঢেউয়ের মত দুলছে। সেই উত্তাপের জাল অতিক্রম করে দৃষ্টি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না।

ইসহাক তুর্কী আবার চলতে শুরু করল। সে তখন পা টেনে টেনে চলছিল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল চলে এল। কিন্তু তার তখন দিন রাত্রির কোন অনুভুতি ছিল না। পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। গরম বালির ছ্যাকা খেয়ে জ্বলছিল পা দুটো।

সামনে বিস্তর ঢালু ভূমি। সেই ঢালুতে পা দিতেই হঠাৎ পা হড়কে পিছলে পড়ে গেল সে। তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে অনেক নিচে গিয়ে যখন থামল তার শরীর, তখন তার হুশ ছিল না।

একটু পরই জ্ঞান ফিরে এল তার। সে সজাগ ও সতর্ক হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো। না, কোথেও কোন প্রাণের ছোঁয়া নেই। তার চিন্তাশক্তি তখন লোপ পেয়েছিল, কিন্তু অবচেতন মনে ছিল দায়িত্বের তাগিদ। সে মনের অজান্তেই এক টিলার ওপর গিয়ে আরোহণ করল। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, সেখান থেকেও সে গড়িয়ে পড়ে গেল নিচে।

আবার যখন উঠে বসলো তখন পানির তীব্র তেষ্টা অনুভব করলো। তার ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। গলা ছিল খরখরে শুকনো। সামান্য পানি পান করার জন্য সে নিজের মশকের দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু মশক বা খেজুরের ব্যাগ কিছুই তার সাথে নেই।

সে মশক বা খেজুরের ব্যাগ কোথায় ফেলে এসেছে মনে করতে পারল না। হয়তো গড়িয়ে পড়ার সময় সেগুলো তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সে এদিক ওদিক লক্ষ্য করে দেখলো কোথাও তা দেখা যায় কি না। কিন্তু না, তার শূন্য দৃষ্টি ফিরে এল, কোথাও মশক বা ব্যাগের আভাসও নজরে এল না। সে ওখানে ওভাবেই বসে রইল। বোবা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল অসীম শূন্যতার রাজ্যে।

এ দুটো জিনিস হারানোর পর তার উদ্যম ও সাহস পুরোপুরিই নিঃশেষ হয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেল তার সংকল্প ও মিশনের কথা। তাই সে বসা থেকে উঠারও কোন গরজ অনুভব করল না।

কিন্তু সে কেবল সাময়িক সময়ের জন্য। আবার তার সংকল্পের কথা মনে পড়ে গেল। সে তার দুর্বল পা দুটোকে টেনে তুলল এবং একদিকে হাঁটা দিল।

সে নিরাশ ও অসহায়ের মত পথিকের মতই পথ চলছিল। ঝাপসা দৃষ্টি মেলে ধরে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিল, সে ঠিক পথে এগুচ্ছে কি না।

কখন সন্ধ্যা হলো, কখন মরুভূমিতে নেমে এলো শীতল রাত কিছুই মনে করতে পারলনা ইসহাক তুর্কী। তার শুধু মনে পড়ল, সামনে সে একবার উজ্জ্বল আলোর শিখা দেখেছিল। যদিও সে আলো তার কাছ থেকে বহু দূরে ছিল। সে অর্ধচৈতন্য নিয়ে অনেকটা বেহুশের মত সে আলোর দিকে তখনো পা পা টেনে টেনে এগিয়ে যাচ্ছিল।

অজ্ঞান অবস্থায় কি হাঁটা যায়? হয়তো যায়। নইলে এতটা পথ সে এলো কি করে! ইসহাক তুর্কী যখন হুশ ফিরে পেওও তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতো। তার মনে হলো, সে সজ্ঞানে পথ চলছে না। কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

এই ঘোরের মধ্যে চলতে চলতেই এক সময় সে থেমে গেল। তার মনে হলো, সে দুটি পুরুষ ও একটি মেয়ে মানুষ দেখতে পাচ্ছে। অরা তিনজনই তার দিওকে তাকিয়ে আছে। সে তাদের পেছনে ক্লিছু দূরে খেজুরের গাছ ও দেখতে পাচ্ছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি টিলা।

ইসহাক তুর্কী এটাকেও দৃষ্টির বিভ্রম মনে করলো। মনে করল, তাকে গ্রাস করার আগে মরুভূমি মায়ার খেলা শুরু করেছে। মরুভূমি দিকভ্রান্ত পথিককে মারার আগে হামেশাই এ খেলা খেলে থাকে।

পেজঃ ১ম পেজ | ← পূর্বের পেজ | 1 | 2 | 3 | 4 | ... | পরের পেজ → | শেষ পেজ | | সম্পুর্ণ বই এক পেজে »

Top